সৌরজগতের ১১টি জগৎ
প্রত্যেকটিকে উপরে ঘুরিয়ে দেখা যায়, আর নাম চাপলে তার নিজের পাতায় পুরো লেখা।
সূর্যSun
সূর্য একটা বিশাল আগুনের বল - আসলে একটা তারা! এটা এত বড় যে এর ভেতরে ১০ লাখ পৃথিবী ঢুকে যাবে। সূর্যের আলো আর তাপ না থাকলে পৃথিবীতে কোনো গাছ, প্রাণী বা মানুষ থাকত না।
বুধMercury
বুধ সবচেয়ে ছোট গ্রহ আর সূর্যের সবচেয়ে কাছে। এটা এত দ্রুত সূর্যকে ঘোরে যে বুধে এক বছর মাত্র ৮৮ দিনের! দিনে ভীষণ গরম, রাতে ভীষণ ঠান্ডা।
শুক্রVenus
শুক্র দেখতে পৃথিবীর মতোই বড়, কিন্তু এটা সৌরজগতের সবচেয়ে গরম গ্রহ! ঘন মেঘে ঢাকা বলে সূর্যের তাপ আটকে থাকে। সন্ধ্যায় আকাশে যে উজ্জ্বল "তারা"টা দেখো, সেটা আসলে শুক্র।
পৃথিবীEarth
এটাই আমাদের বাড়ি! পৃথিবীর বেশির ভাগটাই নীল, কারণ এর তিন ভাগ পানি। এটাই একমাত্র গ্রহ যেখানে আমরা জানি প্রাণ আছে - গাছ, মাছ, পাখি, আর তুমি।
চাঁদMoon
চাঁদ রাতের আকাশে সবচেয়ে বড় আর উজ্জ্বল - কিন্তু চাঁদের নিজের আলো নেই! সূর্যের আলো চাঁদে পড়ে আমাদের চোখে আসে। ১৯৬৯ সালে মানুষ প্রথম চাঁদে পা রাখে।
মঙ্গলMars
মঙ্গল লাল দেখায় কারণ এর মাটিতে মরিচা পড়া লোহা আছে! এখানে সৌরজগতের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় আছে - এভারেস্টের প্রায় তিন গুণ উঁচু। মানুষ একদিন এখানে যেতে চায়।
বৃহস্পতিJupiter
বৃহস্পতি সবচেয়ে বড় গ্রহ - এর ভেতরে ১,৩০০টা পৃথিবী ঢুকে যাবে! এটা গ্যাসের তৈরি, তাই এখানে দাঁড়ানোর মতো মাটি নেই। এর গায়ের লাল দাগটা আসলে একটা ঝড়, যা পৃথিবীর চেয়েও বড়।
শনিSaturn
শনির গায়ে সুন্দর বলয় আছে - বরফ আর পাথরের চুড়ির মতো! শনি এত হালকা যে একটা বিশাল বাথটাবে ফেললে ভেসে থাকত। ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত এর ২৯৩টি নিশ্চিত চাঁদ জানা গেছে - যেকোনো গ্রহের চেয়ে বেশি।
ইউরেনাসUranus
ইউরেনাস একটা নীলচে-সবুজ গ্রহ যা পাশ ফিরে শুয়ে ঘোরে - যেন গড়িয়ে গড়িয়ে সূর্যকে ঘুরছে! এখানে এত ঠান্ডা যে থার্মোমিটারও জমে যাবে। ইউরেনাসে এক বছর মানে পৃথিবীর ৮৪ বছর।
নেপচুনNeptune
নেপচুন সূর্য থেকে সবচেয়ে দূরের গ্রহ - গাঢ় নীল আর ভীষণ ঝড়ো। এখানে বাতাস এত জোরে বয় যে সৌরজগতে আর কোথাও তেমন নেই। নেপচুন আবিষ্কারের পর থেকে মাত্র একবার সূর্যকে ঘুরে এসেছে!
প্লুটোPluto
প্লুটো একসময় নবম গ্রহ ছিল, এখন একে বলা হয় "বামন গ্রহ"। এটা চাঁদের চেয়েও ছোট! প্লুটোর গায়ে একটা বড় হৃদয়ের মতো দাগ আছে, বরফের তৈরি।
গ্রহাণু বলয়মঙ্গল ও বৃহস্পতির মাঝে
মঙ্গল আর বৃহস্পতির মাঝখানে অসংখ্য ছোট-বড় পাথর সূর্যকে ঘিরে ঘুরছে, সেই জায়গাটার নাম গ্রহাণু বলয়।
মজার তথ্যসবচেয়ে বড় গ্রহাণুটির নাম সেরেস, আর সে এত বড় যে তাকে এখন বামন গ্রহ বলা হয়, প্লুটোর মতোই।
ধূমকেতুবরফ ও ধুলো
ধূমকেতু হলো বরফ আর ধুলোর তাল, যা সূর্যের কাছে এলে গলতে শুরু করে আর পেছনে লম্বা উজ্জ্বল লেজ তৈরি হয়।
মজার তথ্যধূমকেতুর লেজ কোটি কিলোমিটার লম্বা হতে পারে, অথচ তা এত পাতলা যে তার ভেতর দিয়ে তারার আলো দিব্যি দেখা যায়।
উল্কাতারা খসা
রাতের আকাশে হঠাৎ যে আলোর রেখা ছুটে যায়, তাকে আমরা তারা খসা বলি, কিন্তু সেটা তারা নয় - একটা ছোট্ট পাথর বাতাসে ঘষা খেয়ে জ্বলে উঠেছে।
মজার তথ্যপ্রতিদিন প্রায় ১০০ টন মহাকাশের ধুলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢোকে, প্রায় পুরোটাই জ্বলে শেষ হয়ে যায় আর কেউ টেরও পায় না।
চাঁদ ও চন্দ্রকলা
স্লাইডার টেনে ২৯ দিনের চক্র চালাও - উপরে আকাশে চাঁদের আকৃতি বদলাবে, নিচে সূর্য-পৃথিবী-চাঁদের অবস্থান।
অমাবস্যাচাঁদ দেখা যায় না
অমাবস্যার রাতে চাঁদ আকাশে থাকে, কিন্তু তার আলোকিত দিকটা আমাদের উল্টো দিকে থাকে বলে আমরা তাকে দেখতে পাই না।
চাঁদ তখন সূর্য আর পৃথিবীর মাঝখানে থাকে। সূর্যের আলো পড়ে চাঁদের যে পিঠে, সেটা তখন পৃথিবীর দিকে নয়, তাই আমাদের দিকের পিঠটা অন্ধকার থাকে।
অমাবস্যা থেকেই চান্দ্রমাস গোনা শুরু হয়, আর আরবি ও বাংলা পঞ্জিকার অনেক হিসাব এর ওপরেই দাঁড়ানো। অমাবস্যার রাত সবচেয়ে অন্ধকার বলে খালি চোখে তারা আর আকাশগঙ্গা দেখার জন্য এটাই সবচেয়ে ভালো সময়।
মজার তথ্যসূর্যগ্রহণ কেবল অমাবস্যাতেই হতে পারে, কারণ তখনই চাঁদ ঠিক সূর্য আর পৃথিবীর মাঝখানে আসে।
প্রথমার্ধঅর্ধেক চাঁদ
অমাবস্যার পর চাঁদ একটু একটু করে বাড়তে থাকে, আর সাত দিনের মাথায় ঠিক অর্ধেক চাঁদ দেখা যায়।
এই সময় চাঁদ আকাশে সন্ধ্যাবেলা মাথার ওপরে থাকে আর মাঝরাতে ডোবে। আলোকিত দিকটা থাকে পশ্চিমে, সূর্য যেদিকে ডুবেছে।
চাঁদ নিজে আলো দেয় না, সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে। আমরা যে আকৃতি দেখি তা আসলে চাঁদের আলোকিত অর্ধেকটার কতখানি আমাদের দিকে ফিরে আছে, তার হিসাব - চাঁদের কোনো অংশ কখনো সত্যিই কাটা পড়ে না।
মজার তথ্যঅর্ধেক চাঁদের দিনেই চাঁদের গর্তগুলো সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায়, কারণ আলো তখন পাশ থেকে পড়ে লম্বা ছায়া ফেলে।
পূর্ণিমাপুরো গোল চাঁদ
পূর্ণিমার রাতে চাঁদকে পুরো গোল থালার মতো দেখায়, কারণ তার আলোকিত পুরো পিঠটাই তখন আমাদের দিকে ফেরানো।
তখন পৃথিবী থাকে সূর্য আর চাঁদের মাঝখানে। পূর্ণিমার চাঁদ সন্ধ্যায় পুব দিকে ওঠে আর ভোরে পশ্চিমে ডোবে, তাই সারা রাত আকাশে থাকে।
চাঁদের কক্ষপথ পুরোপুরি গোল নয়, তাই কোনো পূর্ণিমায় সে একটু কাছে এসে স্বাভাবিকের চেয়ে বড় আর উজ্জ্বল দেখায় - একে বলে সুপারমুন। বাংলা সংস্কৃতিতে পূর্ণিমা বহু উৎসবের দিন ঠিক করে দেয়।
মজার তথ্যপূর্ণিমার চাঁদ অর্ধেক চাঁদের চেয়ে দ্বিগুণ নয়, প্রায় দশ গুণ বেশি উজ্জ্বল, কারণ তখন গর্তগুলোর ছায়াও পড়ে না।
শেষার্ধআবার অর্ধেক
পূর্ণিমার পর চাঁদ আবার ছোট হতে থাকে, আর সাত দিনের মাথায় উল্টো দিকের অর্ধেকটা দেখা যায়।
শেষার্ধের চাঁদ মাঝরাতে ওঠে আর সকালবেলা আকাশে থাকে, তাই সকালের আকাশে ফ্যাকাশে চাঁদ দেখলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
প্রথমার্ধ আর শেষার্ধে আলোকিত দিকটা ঠিক উল্টো থাকে, আর সেটা দেখেই বলে দেওয়া যায় চাঁদ বাড়ছে না কমছে। পুরো চক্রটা শেষ হতে লাগে প্রায় সাড়ে ঊনত্রিশ দিন, যাকে বলে চান্দ্রমাস।
মজার তথ্যচাঁদ সব সময় আমাদের একই পিঠ দেখায়, কারণ সে নিজের চারদিকে ঘুরতে ঠিক যত সময় নেয়, পৃথিবীকে ঘুরতেও তত সময়ই নেয়।
জোয়ার-ভাটাসাগরের টান
চাঁদের টানে সাগরের পানি ফুলে উঠে জোয়ার হয়, আর সরে গেলে ভাটা হয় - দিনে দুবার করে।
চাঁদ পৃথিবীর যে পাশে থাকে, সেখানকার পানিকে সে নিজের দিকে টানে। ঠিক উল্টো পাশেও একটা ফোলা তৈরি হয়, তাই এক দিনে দুবার জোয়ার আর দুবার ভাটা হয়।
সূর্যও পানি টানে, তবে অনেক দূরে বলে তার টান চাঁদের প্রায় অর্ধেক। অমাবস্যা আর পূর্ণিমায় দুজনের টান এক লাইনে পড়ে বলে জোয়ার সবচেয়ে বড় হয়, একে বাংলায় বলে ভরা কটাল।
মজার তথ্যসুন্দরবনের বাদাবনের গাছগুলো দিনে দুবার লবণপানিতে ডুবে যায় আর ভেসে ওঠে, আর সেই ছন্দেই তাদের শ্বাসমূল মাটির ওপরে বেরিয়ে থাকে।
সূর্যগ্রহণচাঁদ সূর্যকে ঢাকে
চাঁদ যখন ঠিক সূর্য আর পৃথিবীর মাঝখানে এসে পড়ে, তখন দিনের বেলাতেই সূর্য ঢাকা পড়ে যায় - একে বলে সূর্যগ্রহণ।
চাঁদ সূর্যের চেয়ে অনেক ছোট, কিন্তু অনেক কাছেও, তাই আকাশে দুজনকে প্রায় সমান বড় দেখায়। সেজন্যই চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে দিতে পারে।
পূর্ণগ্রহণের সময় সূর্যের চারপাশের ক্ষীণ আলোর মুকুট, করোনা, খালি চোখে দেখা যায় - আর অন্য কোনো সময় তা দেখা যায় না। সূর্যগ্রহণ কখনোই খালি চোখে দেখা উচিত নয়, তাতে চোখের স্থায়ী ক্ষতি হয়।
মজার তথ্যএটা একটা নিছক কাকতাল: সূর্য চাঁদের চেয়ে প্রায় ৪০০ গুণ বড়, আর ঠিক প্রায় ৪০০ গুণ দূরেও - তাই দুজনকে এক মাপের দেখায়।
চন্দ্রগ্রহণপৃথিবীর ছায়া
পৃথিবী যখন সূর্য আর চাঁদের মাঝখানে এসে চাঁদের ওপর ছায়া ফেলে, তখন চন্দ্রগ্রহণ হয়।
চন্দ্রগ্রহণ কেবল পূর্ণিমার রাতেই হতে পারে, আর সূর্যগ্রহণের উল্টো - এটা খালি চোখে দেখা একদম নিরাপদ। রাতের যে দিকটায় চাঁদ দেখা যাচ্ছে, সেখানকার সবাই একসঙ্গে দেখতে পায়।
পুরোপুরি ঢাকা পড়লেও চাঁদ কালো হয়ে যায় না, তামাটে লাল দেখায়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল সূর্যের আলো বাঁকিয়ে চাঁদের গায়ে ফেলে, আর তাতে নীল আলো ছড়িয়ে গিয়ে লাল আলোটুকুই পৌঁছায় - ঠিক যে কারণে সূর্যাস্ত লাল দেখায়।
মজার তথ্যএই লাল চাঁদকে অনেকে রক্তচাঁদ বলে, আর সেই রঙের আসল মানে হলো ওই মুহূর্তে পৃথিবীর সব সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের আলো একসঙ্গে চাঁদের ওপর পড়ছে।
চাঁদে অবতরণ১৯৬৯ সাল
১৯৬৯ সালে মানুষ প্রথমবার চাঁদে নেমেছিল, আর সেই পায়ের ছাপ আজও চাঁদের ধুলোয় রয়ে গেছে।
অ্যাপোলো-১১ নামের অভিযানে নীল আর্মস্ট্রং আর বাজ অলড্রিন চাঁদে নেমেছিলেন। চাঁদে বাতাস নেই বলে ভারী পোশাক আর অক্সিজেন ছাড়া এক মুহূর্তও থাকা যায় না।
ছয়টি অভিযানে মোট বারোজন মানুষ চাঁদে হেঁটেছেন, আর তাঁরা প্রায় ৩৮২ কেজি পাথর ও ধুলো পৃথিবীতে নিয়ে এসেছিলেন। সেই নমুনা থেকেই জানা গেছে চাঁদ সম্ভবত পৃথিবীর সঙ্গে বিশাল এক সংঘর্ষের পর ছিটকে বেরোনো টুকরো থেকে তৈরি।
মজার তথ্যচাঁদে বাতাস নেই, তাই বৃষ্টি বা হাওয়ায় কিছু মোছে না - ওই পায়ের ছাপ লক্ষ লক্ষ বছর একই রকম থাকবে।
চাঁদের গর্তগর্তে ভরা মুখ
চাঁদের গায়ে অসংখ্য গোল গর্ত, যেগুলো তৈরি হয়েছে মহাকাশের পাথর এসে আছড়ে পড়ে।
পৃথিবীতেও এমন পাথর পড়ে, কিন্তু আমাদের বায়ুমণ্ডল বেশির ভাগকে পুড়িয়ে দেয় আর বৃষ্টি-বাতাস পুরনো গর্ত মুছে ফেলে। চাঁদের বাতাসও নেই, পানিও নেই, তাই প্রতিটি দাগ থেকে যায়।
চাঁদের সবচেয়ে বড় অববাহিকাগুলো প্রায় ৪০০ কোটি বছরের পুরনো, যখন সৌরজগৎ জুড়ে পাথরের বৃষ্টি হতো। খালি চোখে চাঁদে যে কালচে ছোপগুলো দেখা যায়, সেগুলো আসলে গর্ত নয় - পুরনো লাভায় ভরে যাওয়া সমতল, যাদের নাম দেওয়া হয়েছিল সাগর।
মজার তথ্যচাঁদে কোনো সাগরে এক ফোঁটা পানিও নেই; পুরনো জ্যোতির্বিদরা দূর থেকে কালো সমতল দেখে ভুল করে নাম রেখেছিলেন, আর নামগুলো রয়ে গেছে।
তারা ও তারামণ্ডল
রাতের আকাশে বিন্দু জোড়া দিয়ে তারামণ্ডল আঁকো; জোড়া লাগলে পৌরাণিক ছবিটি ফুটে ওঠে।
তারার জন্মগ্যাসের মেঘ
তারার জন্ম হয় মহাকাশের বিশাল গ্যাস আর ধুলোর মেঘে, যেখানে সব কিছু নিজের টানে একসঙ্গে জড়ো হতে থাকে।
মেঘের একটা অংশ যত চেপে বসে, ভেতরটা তত গরম হয়। তাপমাত্রা প্রায় এক কোটি ডিগ্রিতে পৌঁছালে হাইড্রোজেন পরমাণু জোড়া লেগে হিলিয়াম হতে শুরু করে, আর তখনই তারাটি জ্বলে ওঠে।
এই জোড়া লাগাকে বলে নিউক্লিয়ার ফিউশন, আর সেটাই তারার সমস্ত আলো ও তাপের উৎস। একটা মেঘ থেকে সাধারণত একসঙ্গে বহু তারা জন্মায়, তাই অল্পবয়সী তারাদের প্রায়ই গুচ্ছ হয়ে থাকতে দেখা যায়।
মজার তথ্যআমাদের সূর্যও এভাবেই জন্মেছিল প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে, আর তার জন্মের ভাইবোন তারারা এখন আকাশগঙ্গার নানা দিকে ছড়িয়ে গেছে।
লাল দানববুড়ো তারা
তারার জ্বালানি ফুরিয়ে আসতে থাকলে সে বিশাল হয়ে ফুলে ওঠে আর লালচে হয়ে যায় - তখন তাকে বলে লাল দানব।
কেন্দ্রের হাইড্রোজেন শেষ হয়ে গেলে তারার ভেতরটা চুপসে যায় আর বাইরের স্তর উল্টো ফুলে ওঠে। ছড়িয়ে পড়া বলে তার গা ঠান্ডা হয়ে যায়, আর ঠান্ডা তারা লাল দেখায়।
আমাদের সূর্যও প্রায় ৫০০ কোটি বছর পর লাল দানব হবে, আর তখন সে বুধ ও শুক্রকে গিলে ফেলবে। রাতের আকাশে কালপুরুষের কাঁধের লালচে তারা আর্দ্রা এমনই এক দানব, যে সূর্যের চেয়ে কয়েকশো গুণ চওড়া।
মজার তথ্যআর্দ্রাকে যদি সূর্যের জায়গায় বসানো যেত, তার গা মঙ্গল গ্রহ ছাড়িয়ে যেত - পৃথিবী থাকত তারার ভেতরে।
শ্বেত বামনতারার ছাই
ছোট তারা জ্বালানি শেষ করে ফুলে ওঠার পর বাইরের গ্যাস ছেড়ে দেয়, আর ভেতরে থেকে যায় ছোট্ট গরম একটা কেন্দ্র - শ্বেত বামন।
শ্বেত বামন পৃথিবীর মতো ছোট, অথচ তার ভেতরে প্রায় গোটা সূর্যের সমান পদার্থ ঠাসা। সে নতুন করে জ্বলে না, শুধু জমে থাকা তাপ ছড়াতে ছড়াতে কোটি কোটি বছর ধরে ঠান্ডা হয়।
শ্বেত বামনের এক চা-চামচ পদার্থের ওজন হবে কয়েক টন। সূর্যের মতো তারারা এভাবেই শেষ হয়; বিস্ফোরণ ছাড়াই, চারপাশে ছুঁড়ে দেওয়া গ্যাসের সুন্দর একটা বলয় রেখে, যাকে বলে গ্রহ-নীহারিকা।
মজার তথ্যমহাবিশ্ব এখনো এত অল্পবয়সী যে একটাও শ্বেত বামন পুরোপুরি ঠান্ডা হয়ে নিভে যাওয়ার সময় পায়নি।
সুপারনোভাবিরাট বিস্ফোরণ
অনেক বড় তারা জীবনের শেষে ভয়ংকর জোরে ফেটে যায়, আর সেই বিস্ফোরণের নাম সুপারনোভা।
ফাটার মুহূর্তে একটা তারা গোটা একটা গ্যালাক্সির সব তারার চেয়েও বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারে, কয়েক সপ্তাহের জন্য। তারপর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়।
সুপারনোভার প্রচণ্ড তাপে লোহার চেয়ে ভারী মৌলগুলো তৈরি হয় আর মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের রক্তের লোহা, হাড়ের ক্যালসিয়াম, গয়নার সোনা - সব কিছুই কোনো না কোনো মরে যাওয়া তারার ভেতরে বানানো।
মজার তথ্যআক্ষরিক অর্থেই আমরা তারার ধুলো দিয়ে তৈরি: আমাদের শরীরের প্রায় সব পরমাণু একসময় কোনো তারার ভেতরে ছিল।
নিউট্রন তারাশহরের সমান
সুপারনোভার পর কখনো কখনো থেকে যায় একটা ছোট্ট কিন্তু অসম্ভব ভারী তারা, যার নাম নিউট্রন তারা।
একটা নিউট্রন তারা চওড়ায় মাত্র কুড়ি কিলোমিটারের মতো, একটা শহরের সমান, অথচ তার ভেতরে সূর্যের চেয়েও বেশি পদার্থ ঠাসা।
এত চাপে পরমাণু আর টিকতে পারে না, ইলেকট্রন আর প্রোটন মিশে নিউট্রন হয়ে যায় - নামটা সেখান থেকেই। অনেক নিউট্রন তারা মিনিটে হাজার বার পাক খায় আর নিয়মিত ছন্দে সংকেত পাঠায়, তাদের বলে পালসার।
মজার তথ্যনিউট্রন তারার এক চা-চামচ পদার্থের ওজন হবে প্রায় একশো কোটি টন, অর্থাৎ পৃথিবীর সব মানুষের মোট ওজনের চেয়েও বেশি।
কৃষ্ণগহ্বরআলোও পালায় না
কৃষ্ণগহ্বর এমন একটা জায়গা যেখানে টান এত প্রবল যে আলো পর্যন্ত বেরিয়ে আসতে পারে না, তাই সেটা একদম কালো দেখায়।
সবচেয়ে ভারী তারাগুলো শেষে নিজের ভারেই চুপসে গিয়ে কৃষ্ণগহ্বর হয়। তার একটা সীমানা আছে, যার নাম ঘটনা-দিগন্ত; ওই সীমা পেরোলে আর ফেরার পথ নেই।
কৃষ্ণগহ্বর মহাকাশ শুষে নেয় না, বরং যেকোনো সমান ভরের বস্তুর মতোই টানে - সূর্যকে সমান ভরের কৃষ্ণগহ্বরে বদলে দিলে পৃথিবী আগের কক্ষপথেই ঘুরত, শুধু অন্ধকারে। প্রায় প্রতিটি বড় গ্যালাক্সির কেন্দ্রে একটা বিশাল কৃষ্ণগহ্বর আছে।
মজার তথ্যকৃষ্ণগহ্বরের এত কাছে সময় এত ধীরে চলে যে সেখানে কাটানো এক ঘণ্টায় দূরের মহাকাশে বছর পেরিয়ে যেতে পারে।
ধ্রুবতারাউত্তর দিক
ধ্রুবতারা আকাশে প্রায় একই জায়গায় স্থির থাকে আর সব সময় উত্তর দিক দেখায়, তাই পথ চেনাতে তার জুড়ি নেই।
পৃথিবীর ঘূর্ণনের অক্ষ ঠিক ধ্রুবতারার দিকে তাক করা, তাই রাতের আকাশের বাকি সব তারা তাকে ঘিরে ঘোরে আর সে এক জায়গাতেই থাকে।
সপ্তর্ষিমণ্ডলের বাটির শেষ দুটি তারা বরাবর সোজা তাকালেই ধ্রুবতারা পাওয়া যায়। পৃথিবীর অক্ষ লাট্টুর মতো ধীরে টলে, তাই কয়েক হাজার বছর পর অন্য একটা তারা উত্তরের তারা হবে।
মজার তথ্যধ্রুবতারা আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারা নয়, বরং প্রায় পঞ্চাশতম - তার আসল কাজ উজ্জ্বলতা নয়, এক জায়গায় থাকা।
কালপুরুষশীতের আকাশ
কালপুরুষ শীতের আকাশের সবচেয়ে সহজে চেনা তারামণ্ডল, যার মাঝখানে সার বেঁধে তিনটি উজ্জ্বল তারা থাকে।
ওই তিনটি তারাকে বলে কালপুরুষের কোমরবন্ধ, আর তার চার কোণে চারটি উজ্জ্বল তারা মিলে একটা বিরাট চতুর্ভুজ বানায়। বাংলাদেশ থেকে ডিসেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত সন্ধ্যার আকাশে একে দেখা যায়।
কোমরবন্ধের নিচে ঝুলে থাকা ঝাপসা আলোর ছোপটা আসলে কালপুরুষ নীহারিকা, একটা তারা তৈরির কারখানা, আর খালি চোখে দেখা যায় এমন কাছের কয়েকটি নীহারিকার একটি।
মজার তথ্যকোমরবন্ধের তিনটি তারা আসলে একে অন্যের কাছাকাছি নয়; তারা আমাদের থেকে ভিন্ন ভিন্ন দূরত্বে আছে আর আমাদের দেখার কোণ থেকেই কেবল এক সারিতে পড়ে।
সপ্তর্ষিমণ্ডলসাত তারা
সাতটি উজ্জ্বল তারা মিলে আকাশে একটা হাতলওয়ালা বাটির মতো আকৃতি বানায়, তার নাম সপ্তর্ষিমণ্ডল।
বাটির শেষ দুই তারা থেকে সোজা রেখা টানলেই ধ্রুবতারা পাওয়া যায়, তাই সপ্তর্ষি চিনলে উত্তর দিক চেনাও শেখা হয়ে যায়।
এই সাত তারা আসলে বৃহত্তর এক তারামণ্ডলের একটা অংশ। বাংলা নামগুলো এসেছে সাত ঋষির নাম থেকে, আর প্রায় প্রতিটি সংস্কৃতিতেই এই আকৃতির নিজস্ব নাম আছে - কোথাও লাঙল, কোথাও ভালুক, কোথাও চামচ।
মজার তথ্যবাটির হাতলের মাঝের তারাটির গা ঘেঁষে একটা ক্ষীণ সঙ্গী তারা আছে, আর প্রাচীনকালে ওটা দেখতে পাওয়াকে চোখ ভালো থাকার পরীক্ষা ধরা হতো।
১২টি রাশি-তারামণ্ডলসূর্যের পথ
সারা বছরে সূর্য আকাশের যে পথ ধরে চলে, সেই পথের ওপর পড়া বারোটি তারামণ্ডলকে বলে রাশিচক্র।
পৃথিবী সূর্যকে ঘোরে বলে আমাদের চোখে মনে হয় সূর্য বছরজুড়ে একেক মাসে একেক তারামণ্ডলের সামনে দিয়ে যাচ্ছে। চাঁদ আর গ্রহগুলোও প্রায় একই পথে চলে, কারণ সবাই মোটামুটি একই সমতলে ঘুরছে।
এগুলো জ্যোতির্বিজ্ঞানের নকশা, ভাগ্যের নয় - কোন তারামণ্ডলের সামনে সূর্য আছে তার সঙ্গে কারও স্বভাব বা ভবিষ্যতের কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। সূর্যের পথে আসলে তেরোটি তারামণ্ডল পড়ে, কিন্তু পুরনো ভাগে বারোটি ধরা হয়েছিল।
মজার তথ্যপৃথিবীর অক্ষ ধীরে টলে যাওয়ায় আজকের তারিখগুলো আর দুই হাজার বছর আগের তারামণ্ডলের সঙ্গে মেলে না, প্রায় এক ঘর সরে গেছে।
আলোকবর্ষদূরত্বের একক
আলোকবর্ষ দূরত্ব মাপার একক - এক বছরে আলো যতটা পথ পাড়ি দেয়, ততটা।
আলো সেকেন্ডে প্রায় তিন লাখ কিলোমিটার যায়, তাই এক আলোকবর্ষ প্রায় সাড়ে নয় লাখ কোটি কিলোমিটার। মহাকাশের দূরত্ব কিলোমিটারে লিখলে শূন্যের সারি এত লম্বা হয় যে পড়াই যায় না।
দূরের কিছু দেখা মানে অতীত দেখা। সূর্যকে আমরা দেখি ৮ মিনিট আগের, নিকটতম তারাকে ৪ বছর আগের, আর অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিকে ২৫ লাখ বছর আগের - মানুষ তখনো আজকের চেহারা পায়নি।
মজার তথ্যআকাশের কোনো তারা আজ রাতে যদি নিভে যায়, তার খবর আমাদের কাছে পৌঁছাতে বহু বছর লেগে যাবে - ততদিন আমরা তাকে জ্বলতেই দেখব।
গ্যালাক্সি ও মহাবিশ্ব
জুম-আউট যাত্রা: তোমার ঘর → পৃথিবী → সৌরজগৎ → গ্যালাক্সি → মহাবিশ্ব, প্রতি ধাপে স্কেল লেখা।
আকাশগঙ্গাআমাদের গ্যালাক্সি
আকাশগঙ্গা হলো আমাদের নিজের গ্যালাক্সি - কয়েকশো কোটি তারার এক বিশাল চাকতি, যার ভেতরে সূর্যও আছে।
শহরের আলো থেকে দূরে গেলে রাতের আকাশে একটা ঝাপসা সাদা ফিতে দেখা যায়। ওটা আসলে আমাদের গ্যালাক্সির চাকতিটাকে ভেতর থেকে পাশ দিয়ে দেখা, আর ওই সাদা ভাবটা অসংখ্য তারার মিলিত আলো।
আকাশগঙ্গা একটা প্যাঁচানো গ্যালাক্সি, চওড়ায় প্রায় এক লাখ আলোকবর্ষ। সূর্য কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে একটা বাহুতে বসে আছে আর গোটা গ্যালাক্সিকে একবার ঘুরে আসতে তার লাগে প্রায় ২৩ কোটি বছর।
মজার তথ্যসূর্য শেষবার গ্যালাক্সির এই জায়গায় ছিল যখন পৃথিবীতে ডাইনোসররা সবে আসছিল।
অ্যান্ড্রোমিডাপাশের গ্যালাক্সি
অ্যান্ড্রোমিডা আমাদের সবচেয়ে কাছের বড় গ্যালাক্সি, আর সে ধীরে ধীরে আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে।
খুব অন্ধকার আকাশে খালি চোখেই একে একটা ঝাপসা ছোপের মতো দেখা যায়, আর সেটাই খালি চোখে দেখা যাওয়া সবচেয়ে দূরের জিনিস।
অ্যান্ড্রোমিডা আমাদের থেকে প্রায় ২৫ লাখ আলোকবর্ষ দূরে আর আকাশগঙ্গার চেয়েও বড়। প্রায় ৪০০ কোটি বছর পর দুটি গ্যালাক্সি মিশে একটা হয়ে যাবে, তবে তারারা এত দূরে দূরে থাকে যে কোনো দুটি তারার ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।
মজার তথ্যবেশির ভাগ গ্যালাক্সি আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, কিন্তু অ্যান্ড্রোমিডা এত কাছে যে অভিকর্ষ তাকে উল্টো টেনে আনছে।
নীহারিকাগ্যাস ও ধুলোর মেঘ
নীহারিকা হলো মহাকাশে ভেসে থাকা গ্যাস আর ধুলোর বিশাল রঙিন মেঘ, যেখানে নতুন তারা জন্মায়।
কিছু নীহারিকা ভেতরের তারার আলোয় জ্বলজ্বল করে, কিছু আবার পেছনের আলো আটকে কালো ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকে। ছবিতে দেখা উজ্জ্বল রংগুলো আসল, তবে আমাদের চোখের চেয়ে ক্যামেরা অনেক বেশি আলো জমাতে পারে বলে সেগুলো এত স্পষ্ট।
তারা তৈরি হওয়ার আগের মেঘ যেমন নীহারিকা, তেমনি তারা মরে গিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া গ্যাসও নীহারিকা - অর্থাৎ একই জিনিস তারার জীবনের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকে, আর সেটাই মহাকাশের পুনর্ব্যবহার।
মজার তথ্যনীহারিকার গ্যাস পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো ল্যাবরেটরিতে বানানো শূন্যের চেয়েও পাতলা; দেখতে ঘন লাগে শুধু কারণ সেটা কয়েক আলোকবর্ষ জুড়ে ছড়ানো।
বিগ ব্যাংসবকিছুর শুরু
প্রায় ১৩৮০ কোটি বছর আগে গোটা মহাবিশ্ব একটা অতি ছোট, অতি গরম বিন্দু থেকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল - তাকেই বলে বিগ ব্যাং।
এটা কোনো জায়গায় ঘটা বিস্ফোরণ নয়; জায়গাটাই তখন থেকে বড় হচ্ছে। তাই বিগ ব্যাং মহাবিশ্বের কোনো এক কোণে হয়নি, সব জায়গাতেই হয়েছে।
প্রমাণ দুটি: সব দূরের গ্যালাক্সি আমাদের থেকে সরে যাচ্ছে, আর গোটা আকাশজুড়ে শুরুর সেই তাপের ক্ষীণ রেশ আজও মেপে পাওয়া যায়, যার নাম মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ। প্রথম কয়েক মিনিটেই মহাবিশ্বের প্রায় সব হাইড্রোজেন আর হিলিয়াম তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
মজার তথ্যপুরনো অ্যানালগ টিভিতে যে ঝিরঝিরে দানা দেখা যেত, তার সামান্য একটা অংশ ছিল বিগ ব্যাংয়েরই বেঁচে থাকা বিকিরণ।
মহাবিশ্বের প্রসারণফুলছে
মহাবিশ্ব থেমে নেই, সে ক্রমাগত বড় হচ্ছে - দূরের গ্যালাক্সিগুলো একে অন্যের থেকে সরে যাচ্ছে।
গ্যালাক্সিগুলো মহাকাশের ভেতর দিয়ে ছুটছে না; মহাকাশটাই তাদের মাঝখানে বেড়ে যাচ্ছে। ফুলতে থাকা বেলুনের গায়ে আঁকা ফোঁটাগুলো যেভাবে একে অন্যের থেকে দূরে সরে, অনেকটা সেভাবেই।
যে গ্যালাক্সি যত দূরে, সে তত দ্রুত সরছে - এই নিয়মটাই প্রসারণের সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ। মাপজোক বলছে প্রসারণ কমছে না, বরং বাড়ছে, আর তার পেছনের কারণটাকে বলা হয় ডার্ক এনার্জি।
মজার তথ্যবেলুনের উদাহরণে কোনো ফোঁটাই কেন্দ্র নয়, আর মহাবিশ্বেও তাই: যে যেখানেই থাকুক, তার মনে হবে সবাই তার কাছ থেকেই দূরে সরছে।
ডার্ক ম্যাটারদেখা যায় না
ডার্ক ম্যাটার এমন কিছু যা চোখে বা দূরবীনে দেখা যায় না, কিন্তু তার টান গ্যালাক্সিগুলোকে ধরে রাখে।
গ্যালাক্সির বাইরের তারারা যত জোরে ঘুরছে, শুধু দেখা যাওয়া পদার্থের টানে তারা ছিটকে বেরিয়ে যেত। তাই সেখানে আরও কিছু ভর আছে, যা আলো ছাড়ে না, শোষণও করে না।
হিসাব বলছে মহাবিশ্বের প্রায় ২৭ ভাগই ডার্ক ম্যাটার, আর আমাদের চেনা পদার্থ মোটে ৫ ভাগ। এটা কী দিয়ে তৈরি তা এখনো কেউ জানে না, আর সেটা খুঁজে বের করা আজকের পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটা।
মজার তথ্যনামটা "কালো" বলে নয়, "অজানা" বলে - বিজ্ঞানে ডার্ক শব্দটা প্রায়ই বোঝায় আমরা এখনো এটা বুঝিনি।
কৃষ্ণগহ্বরের ছবি২০১৯ সালের ছবি
২০১৯ সালে প্রথমবার একটা কৃষ্ণগহ্বরের ছবি তোলা হয়েছিল, আর সেটা দেখতে ছিল কমলা আলোর বলয়ের মাঝে একটা কালো গোল।
কৃষ্ণগহ্বরকে সরাসরি দেখা যায় না, কারণ সেখান থেকে আলো বেরোয় না। ছবিতে যা দেখা যায় তা হলো তার চারপাশে ঘুরতে থাকা উত্তপ্ত গ্যাসের আলো, আর মাঝখানের কালো অংশটা তার ছায়া।
ছবিটা তোলা হয়েছিল পৃথিবীর নানা দেশে ছড়িয়ে থাকা আটটি রেডিও দূরবীনকে একসঙ্গে জুড়ে, যাতে গোটা পৃথিবীর সমান চওড়া একটা দূরবীন তৈরি হয়। জমা তথ্যের পরিমাণ এত বেশি ছিল যে ইন্টারনেটে পাঠানো যায়নি, হার্ড ডিস্ক উড়োজাহাজে করে পাঠাতে হয়েছিল।
মজার তথ্যপরের ছবিটা ছিল আমাদের নিজের গ্যালাক্সির কেন্দ্রের কৃষ্ণগহ্বরের, যার ভর সূর্যের প্রায় ৪০ লাখ গুণ।
মহাকাশ অভিযান
রকেটের স্তর খুলে দেখা, জ্বালানি-ওজন মিলিয়ে উৎক্ষেপণ - ভুল হলে কেন ব্যর্থ হলো তা দেখায়।
রকেটধাক্কা দিয়ে ওঠা
রকেট পেছন দিকে প্রচণ্ড জোরে গ্যাস ছোড়ে, আর সেই ধাক্কাতেই সে সামনের দিকে উঠে যায়।
এটাই নিউটনের তৃতীয় সূত্র: যত জোরে ধাক্কা দেবে, তত জোরেই উল্টো ধাক্কা খাবে। ফুলিয়ে ছেড়ে দেওয়া বেলুন ঠিক এই কারণেই ঘরময় ছোটে।
রকেট মহাকাশে বাতাসে ভর দিয়ে চলে না, তার নিজের ছোড়া গ্যাসের ধাক্কাতেই চলে - তাই শূন্যেও কাজ করে। পৃথিবীর টান কাটিয়ে কক্ষপথে থাকতে হলে সেকেন্ডে প্রায় ৮ কিলোমিটার বেগ লাগে, আর সেজন্যই রকেটের প্রায় পুরোটাই জ্বালানি।
মজার তথ্যবড় রকেট উৎক্ষেপণের সময় তার ওজনের প্রায় ৯০ ভাগই জ্বালানি; যাত্রী আর যন্ত্রপাতি মিলিয়ে থাকে খুব সামান্য অংশ।
কৃত্রিম উপগ্রহপৃথিবীকে ঘোরে
কৃত্রিম উপগ্রহ হলো মানুষের বানানো যন্ত্র, যা পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরতে থাকে আর ছবি তোলে, আবহাওয়া দেখে বা সংকেত পাঠায়।
উপগ্রহ আসলে অবিরাম পৃথিবীর দিকে পড়ছে, কিন্তু পাশের দিকে এত জোরে ছুটছে যে পৃথিবীর বাঁক তার পড়ার সঙ্গে সমান তালে সরে যায় - তাই সে কখনো মাটিতে পৌঁছায় না।
কাছের কক্ষপথের উপগ্রহ দিনে কয়েকবার পৃথিবী ঘুরে আসে, আর প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার উঁচুতে থাকা উপগ্রহ ঠিক এক দিনে একবার ঘোরে বলে আকাশে স্থির মনে হয় - টিভি আর আবহাওয়ার উপগ্রহ সেখানেই বসানো হয়।
মজার তথ্যসন্ধ্যার আকাশে যে আলোর বিন্দুটা না মিটমিট করে সোজা চলে যায়, সেটা প্রায় নিশ্চিতভাবেই একটা উপগ্রহ।
মহাকাশ স্টেশনমহাকাশে ঘরবাড়ি
মহাকাশ স্টেশন হলো পৃথিবীর ওপরে ভেসে থাকা একটা গবেষণাগার, যেখানে নভোচারীরা মাসের পর মাস থাকেন।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার ওপরে আর দিনে প্রায় ষোলো বার পৃথিবী ঘুরে আসে - সেখানকার মানুষ প্রতিদিন ষোলোটা সূর্যোদয় দেখেন।
পড়ন্ত অবস্থায় থাকার কারণেই সেখানে সবকিছু ভাসে, মাধ্যাকর্ষণ নেই বলে নয়। ভরশূন্যতায় পেশি আর হাড় দুর্বল হয়ে যায়, তাই নভোচারীদের রোজ দুই ঘণ্টা করে ব্যায়াম করতে হয়। স্টেশনটি ২০০০ সাল থেকে একটানা মানুষের বাস।
মজার তথ্যমহাকাশ স্টেশনকে খালি চোখেই দেখা যায় - ভোরে বা সন্ধ্যায় আকাশ পেরিয়ে যাওয়া একটা উজ্জ্বল, স্থির আলোর বিন্দু হিসেবে।
মঙ্গলযান রোভারমঙ্গলের গাড়ি
রোভার হলো চাকাওয়ালা ছোট গাড়ি, যেটা মঙ্গলের মাটিতে ঘুরে ঘুরে ছবি তোলে আর পাথর পরীক্ষা করে।
রোভারকে সরাসরি রিমোট দিয়ে চালানো যায় না, কারণ সংকেত পৃথিবী থেকে মঙ্গলে পৌঁছাতেই কয়েক মিনিট লাগে। তাই বিজ্ঞানীরা আগে থেকে নির্দেশের তালিকা পাঠান আর রোভার নিজেই পথ বেছে নেয়।
রোভাররা মঙ্গলে পুরনো নদীখাত আর হ্রদের তলানি খুঁজে পেয়েছে, যা প্রমাণ করে সেখানে একসময় তরল পানি ছিল। সবচেয়ে পরিশ্রমী রোভার অপারচুনিটি ৯০ দিনের জন্য পাঠানো হয়েছিল, আর কাজ করেছিল প্রায় পনেরো বছর।
মজার তথ্যএকটা রোভারের চাকায় গর্ত দিয়ে মোর্স কোডে লেখা আছে জেপিএল, তাই সে মঙ্গলের ধুলোয় হাঁটার সঙ্গে সঙ্গে নিজের নাম ছেপে যায়।
হাবলচোখ মহাকাশে
হাবল একটা দূরবীন, যেটা পৃথিবীর বাইরে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে বাতাস তার দেখার পথে বাধা না দেয়।
মাটি থেকে দেখলে বাতাসের কাঁপুনিতে তারা মিটমিট করে আর ছবি ঝাপসা হয়। বায়ুমণ্ডলের ওপরে থাকায় হাবলের ছবি অনেক বেশি স্পষ্ট।
হাবল ১৯৯০ সাল থেকে কাজ করছে আর তার তোলা ছবি থেকেই মহাবিশ্বের বয়স অনেক নিখুঁতভাবে মাপা গেছে। উৎক্ষেপণের পর দেখা যায় তার আয়নায় সামান্য ত্রুটি ছিল, আর নভোচারীরা মহাকাশে গিয়ে সেটা সারিয়ে এসেছিলেন।
মজার তথ্যহাবল একবার আকাশের একটা প্রায় খালি জায়গায় টানা দশ দিন তাকিয়ে ছিল, আর সেই ছবিতে ধরা পড়েছিল হাজার হাজার গ্যালাক্সি।
জেমস ওয়েবহাবলের উত্তরসূরি
জেমস ওয়েব এখনকার সবচেয়ে বড় মহাকাশ দূরবীন, আর সে এমন আলো দেখতে পারে যা আমাদের চোখ পারে না।
সে দেখে অবলোহিত আলোয়, যা ধুলোর মেঘ ভেদ করে আসতে পারে। তাই ওয়েব এমন তারা আর গ্রহ দেখতে পায় যেগুলো হাবলের কাছে ধুলোয় ঢাকা পড়ত।
যন্ত্রটা ঠান্ডা রাখতে হয় বলে তার সঙ্গে টেনিস কোর্টের সমান একটা পাঁচ স্তরের ছাতা আছে, যা সূর্যের তাপ আটকায়। ওয়েব পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ লাখ কিলোমিটার দূরে বসে আছে, আর সেখানে গিয়ে সারানোর কোনো উপায় নেই - তাই সব কিছু প্রথমবারেই ঠিকঠাক খুলতে হয়েছিল।
মজার তথ্যওয়েব এত দূরের ক্ষীণ আলো ধরতে পারে যে তা দিয়ে চাঁদের দূরত্বে রাখা একটা ভোমরার তাপও মেপে ফেলা যেত।
নভোচারীর পোশাকছোট মহাকাশযান
নভোচারীর পোশাক আসলে এক জনের মাপের ছোট্ট মহাকাশযান, যা বাতাস দেয় আর শরীরকে বাঁচিয়ে রাখে।
মহাকাশে বাতাস নেই, তাপমাত্রা রোদে ভয়ংকর গরম আর ছায়ায় ভয়ংকর ঠান্ডা। পোশাকটি ভেতরে চাপ ধরে রাখে, অক্সিজেন দেয় আর দুই দিকের তাপ থেকেই আটকায়।
পোশাকের ভেতরে সরু নলের জাল দিয়ে ঠান্ডা পানি বইয়ে দেওয়া হয় শরীর ঠান্ডা রাখতে, আর বাইরে থাকে ছোট উল্কার আঘাত ঠেকানোর স্তর। গোটা পোশাক প্রায় ১২৭ কেজি ভারী, তবে ভরশূন্যতায় সেটা টের পাওয়া যায় না।
মজার তথ্যপোশাকের হেলমেটের ভেতরে এক টুকরো শক্ত ফোম লাগানো থাকে, কারণ হাত ঢোকানো যায় না আর নাক চুলকালে কিছু একটা দিয়ে ঘষতে হয়।
বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটবাংলাদেশের উপগ্রহ
বঙ্গবন্ধু-১ বাংলাদেশের নিজের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ, যা ২০১৮ সালে মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল।
এটা একটা যোগাযোগ উপগ্রহ: টেলিভিশনের সম্প্রচার, টেলিফোন আর ইন্টারনেটের সংকেত বয়ে নিয়ে যায়। এর আগে বাংলাদেশকে এসব কাজে বিদেশি উপগ্রহ ভাড়া নিতে হতো।
উপগ্রহটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার ওপরে ভূস্থির কক্ষপথে বসানো, তাই আকাশে এক জায়গায় স্থির মনে হয় আর ছাদের ডিশ একদিকে তাক করে রাখলেই চলে। এটি উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নিজস্ব উপগ্রহের মালিক দেশগুলোর তালিকায় ঢোকে।
মজার তথ্যদুর্গম চর বা পাহাড়ি এলাকায় যেখানে তার টানা কঠিন, সেখানে টেলিভিশন আর ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে এই উপগ্রহই কাজে লাগে।
মহাকাশে খাওয়া-ঘুমভাসমান খাবার
মহাকাশে সবকিছু ভাসে, তাই খাবার আর ঘুম দুটোই পৃথিবীর চেয়ে একদম আলাদা।
থালায় খাবার রাখলে ভেসে চলে যাবে, তাই খাবার আসে প্যাকেটে আর অনেকটাই শুকনো - পানি মিশিয়ে খেতে হয়। ঘুমানোর সময় নভোচারীরা দেয়ালে আটকানো ব্যাগে ঢুকে বেল্ট বেঁধে নেন, নইলে ঘুমের মধ্যেই ভেসে বেড়াবেন।
ভরশূন্যতায় নাক বন্ধ হয়ে আসে বলে স্বাদ কমে যায়, তাই ঝাল আর সসের চাহিদা বেশি। লবণ আর গোলমরিচ গুঁড়ো আকারে দেওয়া যায় না - ভেসে গিয়ে যন্ত্রে ঢুকবে - তাই সেগুলো পানিতে গোলা অবস্থায় সরবরাহ করা হয়।
মজার তথ্যমহাকাশে কান্না করলে চোখের পানি গাল বেয়ে পড়ে না, চোখের ওপরেই গোল হয়ে জমে থাকে।